
গণতান্ত্রিক সমাজে মতের বৈচিত্র্যই শক্তি। একই বিষয়ে ভিন্ন ভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি থাকাই স্বাভাবিক। বরং সেই ভিন্ন মতগুলো আলোচনার টেবিলে এলে সিদ্ধান্ত আরও পরিপক্ব হয়। কিন্তু আমরা প্রায়ই যুক্তির বদলে আবেগকে প্রাধান্য দিই। কেউ প্রশ্ন তুললেই তাকে বিরোধী ভাবি, কেউ সমালোচনা করলেই তাকে শত্রু বানিয়ে ফেলি। এতে সত্য চাপা পড়ে যায়, আর চাটুকারিতা জায়গা দখল করে।
রাজনীতির ময়দান থেকে শুরু করে সামাজিক সংগঠন, এমনকি ব্যক্তিগত সম্পর্কেও একই চিত্র। একজন মানুষ একটি সিদ্ধান্তে দ্বিমত পোষণ করলেই তার অতীত অবদান ভুলে যাওয়া হয়। তার সততা, নিষ্ঠা, ত্যাগ সবকিছু এক মুহূর্তে অস্বীকার করা হয়। অথচ মতভেদ মানেই বিদ্বেষ নয়। মতভেদ হতে পারে দায়িত্ববোধ থেকেও, বৃহত্তর স্বার্থের চিন্তা থেকেও।
আমাদের শিখতে হবে, ব্যক্তি ও মতকে আলাদা করে দেখতে। একজন মানুষের একটি মতের সঙ্গে দ্বিমত মানেই সেই মানুষটি খারাপ নয়। আবার নিজের মতই চূড়ান্ত সত্য, এমন অহংকারও পরিহার করতে হবে। ইতিহাস বলে, যে সমাজ প্রশ্নকে দমন করে, সে সমাজ পিছিয়ে পড়ে। আর যে সমাজ ভিন্নমতকে সম্মান দেয়, সে সমাজই এগিয়ে যায়।
ভিন্ন মতকে সহ্য করার সংস্কৃতি গড়ে তুলতে হলে প্রথমেই দরকার আত্মসমালোচনা। আমরা কি সত্যিই অন্যের কথা শুনতে প্রস্তুত? নাকি শুধু নিজের কথাই প্রতিষ্ঠা করতে চাই? যদি আলোচনার লক্ষ্য হয় সত্য অনুসন্ধান, তবে তর্ক হবে গঠনমূলক। আর যদি লক্ষ্য হয় জয়-পরাজয়, তবে সম্পর্ক ভেঙে যাবে।
সমাজে সুস্থ পরিবেশ গড়তে হলে আমাদের ভাষা ও আচরণেও সংযম আনতে হবে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে হঠাৎ রাগের মাথায় লেখা একটি বাক্য দীর্ঘদিনের সম্পর্ক নষ্ট করতে পারে। তাই প্রতিক্রিয়ার আগে ভাবা জরুরি। মনে রাখা দরকার, মতের অমিল সাময়িক, কিন্তু সম্পর্ক দীর্ঘস্থায়ী।
শেষ কথা হলো, ভিন্নমত কোনো অপরাধ নয়। বরং সেটিই চিন্তার পরিসর বাড়ায়। আমরা যদি সত্যিই উন্নত ও সচেতন সমাজ চাই, তবে “মতের অমিল মানেই শত্রুতা” এই সংকীর্ণ ধারণা থেকে বেরিয়ে আসতেই হবে। পারস্পরিক সম্মান, সহনশীলতা ও যুক্তিনির্ভর আলোচনাই পারে আমাদেরকে আরও পরিণত জাতি হিসেবে গড়ে তুলতে।
লেখক:মো.ওমর ফারুক একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সমাজসচেতন লেখক। তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মাহমুদুল হাসান তারিপ
Copyright © 2026 দৈনিক আজকাল. All rights reserved.