
কাঁদছে, জেদ করছে, কথা শুনছে না—নিষেধ করলেও একই কাজ বারবার করছে। দুই থেকে চার বছরের শিশুকে সামলানো যে কতটা কঠিন, তা বাবা–মায়েরাই ভালো জানেন। এই চাপের মুহূর্তে অনেক সময় বড়দের গলা চড়ে যায়, চিৎকার করে বকাবকি করা হয়ে ওঠে অভ্যাস। আমাদের সমাজে বিষয়টিকে প্রায়ই হালকাভাবে দেখা হয়।
অনেকেই মনে করেন, ‘বাচ্চা তো—ভুলে যাবে।’ কিন্তু বিজ্ঞান বলছে ভিন্ন কথা। বিশেষ করে এক থেকে তিন বছর বয়সী টডলারদের ক্ষেত্রে চিৎকারের প্রভাব তাদের স্নায়ুতন্ত্রে গভীর ছাপ ফেলতে পারে।
শিশুর জীবনের প্রথম কয়েক বছর মস্তিষ্ক বিকাশের সবচেয়ে সংবেদনশীল সময়। এই সময়েই আবেগ নিয়ন্ত্রণ, স্মৃতি গঠন ও স্ট্রেস মোকাবিলার সঙ্গে যুক্ত স্নায়ুপথ তৈরি হয়। হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড–এর তথ্য অনুযায়ী, ছোট শিশুরা উচ্চস্বরে রাগী কণ্ঠকে শাসন হিসেবে নয়, বরং সম্ভাব্য বিপদের সংকেত হিসেবে গ্রহণ করে।
চিৎকার শুনলে শিশুর শরীরে কর্টিসল নামের স্ট্রেস হরমোন নিঃসৃত হয়। এক-দুবার হলে মস্তিষ্ক তা সামলে নিতে পারে। কিন্তু নিয়মিত চিৎকার শিশুর জন্য দীর্ঘমেয়াদি মানসিক চাপ তৈরি করে।
ব্রেইন ইমেজিংভিত্তিক বিভিন্ন গবেষণায় দেখা গেছে, যেসব শিশু শৈশবে নিয়মিত কড়া ও রূঢ় ভাষার মুখোমুখি হয়, তাদের মস্তিষ্কের কিছু অংশে গঠনগত পরিবর্তনের ঝুঁকি বেশি থাকে। বিশেষ করে স্মৃতি, শেখা এবং আবেগ নিয়ন্ত্রণের সঙ্গে যুক্ত অংশগুলো এতে প্রভাবিত হতে পারে।
আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি–তে প্রকাশিত গবেষণাগুলো ইঙ্গিত দেয়, দীর্ঘদিনের উচ্চ স্ট্রেস শিশুদের মনোযোগ ধরে রাখা, আবেগ নিয়ন্ত্রণ এবং তথ্য সংরক্ষণের সক্ষমতাকে দুর্বল করতে পারে।
এখানে কাউকে দোষী করার সুযোগ নেই। এটি ‘ভালো’ বা ‘খারাপ’ বাবা–মা হওয়ার প্রশ্নও নয়। প্যারেন্টিং মানেই ক্লান্তি, চাপ আর ভুল। বিজ্ঞান শুধু এটুকুই বলছে—মস্তিষ্ক অভ্যাস থেকে শেখে। নিয়মিত চিৎকার শিশুকে সতর্ক থাকতে শেখায়, কিন্তু শেখার নিরাপদ পরিবেশ তৈরি করে না। বরং শান্ত ও পূর্বানুমেয় আচরণ শিশুর স্নায়ুতন্ত্রে নিরাপত্তার অনুভূতি জাগায়।
ভালো খবর হলো, শিশুর মস্তিষ্ক অত্যন্ত নমনীয়। একবার বা দু’বার চিৎকার হয়ে গেলেই সব শেষ হয়ে যায় না। গবেষণা বলছে, চিৎকারের পর যদি বাবা–মা শান্তভাবে কথা বলেন, শিশুকে আশ্বস্ত করেন এবং আবেগগত সংযোগ তৈরি করেন, তাহলে শিশুর স্নায়ুতন্ত্র আবার স্থিতিশীল হতে পারে। এতে শিশুর মস্তিষ্ক শেখে—ভুল হলেও সম্পর্কটি নিরাপদ।
সূত্র: হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটি সেন্টার অন দ্য ডেভেলপিং চাইল্ড, আমেরিকান জার্নাল অব সাইকিয়াট্রি, চাইল্ড ডেভেলপমেন্ট ও নিউরোসায়েন্স বিষয়ক গবেষণা পর্যালোচনা
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মাহমুদুল হাসান তারিপ
Copyright © 2026 দৈনিক আজকাল. All rights reserved.