রাজনীতির ইতিহাস আমাদের একটা সত্য বারবার মনে করিয়ে দেয়: সব পরিবর্তন সংবিধানের ভেতর থেকে জন্ম নেয় না। কখনও আন্দোলন আগে আসে, আইনি কাঠামো পরে তৈরি হয়। কখনও জনতার দাবি রাষ্ট্রকে নতুন পথে হাঁটতে বাধ্য করে।তাহলে প্রশ্ন উঠতেই পারে, যখন গণঅভ্যুত্থান সরাসরি সংবিধানের ধারা ধরে হয় না, যখন অন্তর্বর্তীকালীন ব্যবস্থার মতো ধারণা সময়ে সময়ে যুক্ত ও বর্জিত হয়, যখন নির্দিষ্ট বছরের নির্বাচন সংবিধানে লিখিত না থেকেও অনুষ্ঠিত হয়, তখন “জুলাই সনদ বাস্তবায়ন আদেশ” বা তার শপথ নিয়ে সংবিধান খোঁজার তাগিদ কেন?
এই প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে হলে আমাদের দুটো স্তর আলাদা করতে হবে: রাজনৈতিক বাস্তবতা এবং আইনি বৈধতা।
ইতিহাসে আমরা দেখেছি, যেমন বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধ সংবিধানের ধারা থেকে শুরু হয়নি। বরং যুদ্ধের মধ্য দিয়েই রাষ্ট্রের জন্ম, পরে সংবিধান প্রণয়ন। আবার তত্ত্বাবধায়ক সরকারব্যবস্থা একসময় সংবিধানে যুক্ত হয়েছিল, পরে তা বাতিল হয় বাংলাদেশ সুপ্রিম কোর্ট–এর রায়ে। অর্থাৎ, রাজনৈতিক প্রয়োজন কখনও সংবিধানকে বদলায়, আবার সংবিধানও রাজনৈতিক প্রক্রিয়াকে সীমা নির্ধারণ করে।
এখানেই মূল টানাপোড়েন।
জনতার আকাঙ্ক্ষা কি সর্বোচ্চ, নাকি সংবিধানই চূড়ান্ত?
আসলে এ দুটোকে মুখোমুখি দাঁড় করানো ভুল। সংবিধান জনতার ইচ্ছারই লিখিত রূপ। কিন্তু সেই ইচ্ছা যদি সময়ের সঙ্গে বদলায়, তখন প্রশ্ন ওঠে: পরিবর্তন কি সংবিধানের ভেতর থেকে হবে, নাকি বাইরে থেকে চাপ সৃষ্টি করে পরে ভেতরে জায়গা করে নেবে?
“জুলাই সনদ” যদি কেবল একটি রাজনৈতিক অঙ্গীকার হয়, তবে তা নৈতিক শক্তি পেতে পারে জনসমর্থন থেকে। কিন্তু যদি তা রাষ্ট্র পরিচালনার অংশ হতে চায়, শপথ বা আদেশের মাধ্যমে কার্যকর হতে চায়, তাহলে স্বাভাবিকভাবেই সংবিধানের সঙ্গে তার সামঞ্জস্য খোঁজা হবে। কারণ রাষ্ট্রের প্রতিটি ক্ষমতা প্রয়োগের ভিত্তি শেষ পর্যন্ত সংবিধানেই দাঁড়ায়।সুতরাং, সংবিধান খোঁজার প্রশ্নটা বিদ্বেষ থেকে নয়, বরং স্থায়িত্ব ও বৈধতার প্রশ্ন থেকে আসে। রাজনৈতিক বাস্তবতা যদি স্থায়ী রূপ পেতে চায়, তবে তাকে আইনি কাঠামোর ভেতরে স্থান করে নিতে হয়। ইতিহাস তাই বলে।
বিতর্ক হওয়া উচিত “সংবিধান বনাম জনগণ” নয়। বরং হওয়া উচিত, কীভাবে জনগণের ইচ্ছাকে সাংবিধানিক কাঠামোর মধ্য দিয়ে টেকসই রূপ দেওয়া যায়। আবেগ দিয়ে পরিবর্তন শুরু হতে পারে, কিন্তু রাষ্ট্র টিকে থাকে আইনের ভিত্তিতে।
লেখক:মো.ওমর ফারুক একজন অনলাইন অ্যাক্টিভিস্ট ও সমাজসচেতন লেখক। তিনি সমসাময়িক রাজনীতি, সামাজিক ন্যায়বিচার ও নাগরিক অধিকার নিয়ে নিয়মিত লেখালেখি করেন।
সম্পাদক ও প্রকাশক: মো. মাহমুদুল হাসান তারিপ
Copyright © 2026 দৈনিক আজকাল. All rights reserved.